নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আওতাধীন ‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থবিরতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক আকতার জাহান কাঁকন। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং পুষ্টি ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নয়ন যেখানে মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত সুফল দৃশ্যমান নয়, সেখানে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বিল-ভাউচার নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে মাঠপর্যায়ে ব্যয় না করে কথিত ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সেমিনার, উপকরণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রদর্শনী ও গবেষণার নামে অর্থ লোপাটের অভিযোগ
সূত্রগুলোর দাবি, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ ও গবেষণার নামে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও এর বিপরীতে বাস্তব কার্যক্রম কতটুকু হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে গুরুতর সংশয়। প্রদর্শনী ও গবেষণার নামে বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন সেমিনার, প্রশিক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মালামাল গ্রহণ দেখিয়ে হিসাবের কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্রয়ে প্রকৃত মূল্য, পরিমাণ ও সরবরাহের সঙ্গে বিল-ভাউচারের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষক-উদ্যোক্তাদের টাকা কাটার অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মাঠপর্যায়ের কৃষক ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রদর্শনী ও উপকরণ বাবদ অর্থ বিতরণে। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দের পুরো অর্থ সুবিধাভোগীদের না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে একটি অংশ কেটে রাখা হয়েছে।
রাঙ্গামাটি সদর, রাজস্থলী, বানিয়ারচর ও বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকজন উদ্যোক্তার অভিযোগ, তারা নির্ধারিত হারে ভাতা পাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন উদ্যোক্তা দাবি করেন, প্রকল্পের কাগজপত্রে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়, বাস্তবে তারা তার পুরোটা পাননি।
প্রকল্পের নামে বরাদ্দ, মাঠে নেই কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মাশরুম উৎপাদন ও চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং পুষ্টি উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের কার্যক্রমের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ তদারকি ও মাঠপর্যায়ের মনিটরিং না থাকায় প্রকল্পের সুফলভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে।
‘প্রভাবশালী’ পরিচয়ে দাপটের অভিযোগ
ডিএই’র একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, প্রকল্প পরিচালক আকতার জাহান কাঁকন বিভিন্ন মহলে নিজের প্রভাব ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের কথা বলে দাপট দেখান। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির এত অভিযোগের পরও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি কীভাবে বহাল রয়েছেন? প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার, প্রশিক্ষণ ব্যয় এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি কেবল ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; বরং সরকারি অর্থের অপচয়, প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়া এবং কৃষক-উদ্যোক্তাদের অধিকার বঞ্চিত করার গুরুতর ঘটনা। তাই প্রকল্পটির শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব বিল-ভাউচার, ক্রয়প্রক্রিয়া, ব্যাংক লেনদেন, প্রশিক্ষণ তালিকা, সুবিধাভোগীদের অর্থপ্রাপ্তি, প্রদর্শনী ও গবেষণা ব্যয় এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে অডিট ও তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আকতার জাহান কাঁকনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই অপরিহার্য।










