
অটিজম বৈশিষ্টসম্পন্নসহ সব বিশেষ শিশুকে সমাজের মূল ধারায় এনে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট সম্পন্ন শিশুরা বিশেষ প্রতিভার অধিকারী হয়। তাদের সঠিক যত্ন নেওয়া হলে সে প্রতিভা বিকাশ সম্ভব।
শনিবার (২ এপ্রিল) বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ১৫তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০২২ এর অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুদের স্থায়ী আবাসন ও তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে সরকার। এসময় তিনি একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে নিয়ে আসার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন।
খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারকদের নাম উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্টিফেন হকিংসহ অনেকের এই বৈশিষ্ট্য ছিলো। কিন্তু তারা তো তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সুযোগ পেলে আমাদের এই শিশু-কিশোররা রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে।
মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দেশে ও বিদেশ অটিজমের গুরুত্ব, সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, মূলত তার (পুতুল) কাছ থেকেই অটিজম বিষয়ে শিখেছি এবং জেনেছি। সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতো, তখন আমি যেতাম এবং সেই সময় থেকেই এই সম্পর্কে কিছু ধারণা পাই। পুতুলের প্রচেষ্টায় দেশে-বিদেশে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে
তিনি আরো বলেন, আমরা ছোট বেলায় শিখেছি কানাকে কানা বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না। এটা যেন সকল শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শেখে। কাজেই সেই দিকটায় সবার বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।
বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে জাতিসংঘ এই দিবসটি ঘোষণা দিয়েছে দেখে আমরা এটা উদযাপন করছি। উদযাপন শুধু না এর মাধ্যমে সমাজের কাছে আমরা একটা সচেতনতা সৃষ্টি করার সযোগ পাচ্ছি। কাজেই এরা (অটিস্টিক) আমাদের আপনজন এবং তাদেরকে দেখা তাদের যত্ন নেয়া, এটা সকল সুস্থ মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
এসময় অটিজম বৈশিষ্ট সম্পন্ন শিশুদের আপন করে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় তাদের বিষয়ে সচেতন ও যত্নবান হতে হবে। আগে তো বড় পরিবার ছিলো, সেখানে সবার সঙ্গে মিশে এটি ওভারকাম করা গেছে। এখন ছোট পরিবারে এটি দুষ্কর হয়ে গেছে। এজন্য সব যায়গায় তাদের বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। আপন করে নিতে হবে। যত্ন নিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে এটা কোনো সমস্যা নয়।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালে নিউরো ডেভমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করি। এই ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশে অটিজমসহ নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী (এনডিডি) ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রমও আমরা গ্রহণ করি। আমরা এই ট্রাস্টকে ১৪৩ কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেছি। এই ট্রাস্ট থেকে ২০১৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত ৫ হাজার ৭০১ জনকে ৪ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এনডিডির মাধ্যমে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তির গৃহভিত্তিক পরিচর্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার জন্য কোভিড পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ৫৩টি জেলার ১৯০টি উপজেলার ৩৯০ জন পিতা-মাতা/অভিভাবকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০টি জেলার ১০৫টি উপজেলার ১১৫টি বিদ্যালয়ের ৪৫০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এটি এখনো চলমান রয়েছে। এছাড়াও ‘বলতে চাই’ ও ‘স্মার্ট অটিজম বার্তা’ নামক দুটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজমসহ এনডিডি ব্যক্তির স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সাধারণ বিমা করপোরেশনের সঙ্গে ট্রাস্ট যৌথভাবে ‘বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বিমা’ বাস্তবায়ন করছে। এছাড়াও এনডিডি ব্যক্তিকে প্রতিবছর এককালীন আর্থিক চিকিৎসা অনুদান প্রদান করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ‘বলতে চাই’ অমৌখিক যোগাযোগ সহজ করবে। শিশুর অটিজম আছে সন্দেহ হলে সহজেই ‘স্মার্ট অটিজম বার্তা’ অ্যাপ দ্বারা ঘরে বসেই অটিজম আছে কি না তা জানা যাবে।
তিনি বলেন, এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্টের আওতায় এ বছরই ১৪টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘অটিজম ও এনডিডি সেবা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে অটিজমসহ অন্যান্য এনডিডি শিশু ও ব্যক্তিদেরকে জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপে সোশ্যাল ও মেডিকেল পদ্ধতির সমন্বয়ে ১৭ ধরনের বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হবে। মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম দ্বারা আন্তর্জাতিক মানের আর্লি ইন্টারভেনশনসহ এসব সেবা প্রদান করা হবে। এ কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতিম, অভিভাবকহীন এনডিডি ব্যক্তির অভিভাবক নিয়োগ এবং তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে সংগঠন নিবন্ধন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ট্রাস্ট কর্তৃক গুচ্ছ পদ্ধতিতে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্টকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এজন্য আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।










