বার্তা৭১ ডটকমঃ সংসদীয় কমিটিগুলোকে অকার্যকর দাবি করে এজন্য ‘এককেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ’কে চিহ্নিত করেছে টিআইবি, যাদের ‘একচোখা নীতি’র সমালোচনায় মুখর মন্ত্রীরা।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলার সমস্যা ও সমাধানের উপায় নিয়ে রোববার একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী এই প্রতিষ্ঠান, যাতে কমিটিগুলো কার্যকর নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে।
“কমিটির কার্যক্রমও রাষ্ট্র-সংসদের সব কার্যক্রমের মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। সর্বময় ক্ষমতা সংসদ নেতার হাতে। ক্ষমতার এ আধিপত্যে কমিটিগুলো সঠিকভাবে কার্যকর হয় না।”
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অনেকে বলেছে, সংসদ নেতার মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি (সংসদীয় কমিটি)। তার ইচ্ছা ও নির্দেশে সব সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির নিজস্ব মতামত প্রতিফলিত হয় না।”
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান এজন্য বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেন।
“বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রার পর থেকে এককেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয় শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছেই সব ক্ষমতা।”
“এখন ইলেকটেড ডিক্টেটরশিপ চলছে। সরকারের অনেকে বলেছে, গণতন্ত্রের অগ্রগতি হয়েছে। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের যাত্রা পিছিয়েছে। দেশে একটা সময় নির্বাচনের গণতন্ত্র ছিল, এখন তাও শেষ হয়ে গেছে,” বলেন ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা।
বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দুর্নীতির পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছে।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচন ‘সুষ্ঠু হয়নি’ বলে টিআইবি পর্যবেক্ষণ দিলে তার প্রতিক্রিয়ায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, তারা একচোখা নীতি নিয়ে কাজ করছে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বিএনপিবিহীন সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে টিআইবি প্রশ্ন তুললে তারও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ।
দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় কমিটি গঠন করাকে ইতিবাচক বলেছে টিআইবি। তবে কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য এটাই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্যও এসেছে তাদের কাছ থেকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক বা দলীয় প্রভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সদস্য বা মন্ত্রণালয় কমিটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে না করা, কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা না থাকা, এবং হাজিরা, সাক্ষ্য প্রদান ও দলিলপত্র প্রদানে বাধ্য করার ক্ষমতা না থাকার কারণে সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবসায়িক স্বার্থের অনুকূলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকার বিষয়টিতেও জোর দিয়েছে টিআইবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নবম সংসদে ৫১টি কমিটির ছয়টিতে এবং দশম সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে পাঁচটিতে এক বা একাধিক সদস্যের কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। টিআইবি গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১১টি কমিটির ৩৮ জন সদস্যের মধ্যে ৯টিতে ১৯ জন সদস্যের ব্যবসা রয়েছে।
“সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকরে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয়টিতে নজর দিতে হবে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি করার বিষয়টি রোধ করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দূর করতে হবে,” বলেন ইফতেখারুজ্জামান।
সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার যুক্তরাজ্য এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, এই দেশ দুটিতে আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের সমানুপাতিক হারে কমিটিতে সদস্য ও সভাপতি করা হয় এবং মন্ত্রী কমিটির সভাপতি বা সদস্য হন না। আর্থিক কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচন করা হয়।
“এ রকম ভালো উদাহরণগুলো আমাদের দেশে চর্চা করা হলে কমিটিগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর হওয়ার সুযোগের সৃষ্টি হবে।”
টিআইবির গবেষণায় সময়কাল ছিল নবম সংসদের ২০০৯ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০১৩ এবং দশম সংসদের জানুয়ারি ২০১৪ থেকে এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, যোগাযোগ, শ্রম, শিল্প, গৃহায়ন, নৌ, বস্ত্র, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির কার্যক্রম গবেষণায় স্থান পায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবম সংসদে ১১% ও দশম সংসদে ১৭% বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং সভাপতি হিসেবে যথাক্রমে তা ছিল ৪% ও ২%। নবম সংসদে ১১টি কমিটি মোট ৩১ বার এবং দশম সংসদে তিনটি কমিটি মোট তিনবার পুনর্গঠিত হলেও কমিটি পুনর্গঠনের কোনো কারণ প্রকাশিত হয়নি।
নবম ও দশম সংসদে কোনো বিলের জনমত যাচাই-বাছাই করা হয়নি। উল্লিখিত ১১টি কমিটির সুপারিশক্রমে ৭৩টি বিল পাস হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯টি বিলে সংসদ সদস্যরা জনমত যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব দিলেও ৩৭টি বিলের ক্ষেত্রে প্রস্তাব অধিবেশনেই কণ্ঠভোটে নাকচ হয় এবং ৩২টি বিলের ক্ষেত্রে সদস্য অনুপস্থিত থাকায় প্রস্তাব সংসদের অধিবেশনে উত্থাপিত হয়নি।
“অনেক ক্ষেত্রে বিধিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কমিটিগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না,” বলেন ইফতেখারুজ্জামান।
ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফাতেমা আফরোজ।
সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে বিধি-বিধান সংস্কার, বার্ষিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোসহ ১১ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি।
ইফতেখারুজ্জামান জানান, সংসদীয় কমিটিতে দুর্নীতি সম্পর্কিত বিষয়ে মাত্র ৪ শতাংশ আলোচনা হয়েছে। সুপারিশ বাস্তায়নের বিষয়েও কোনো অগ্রগতি নেই।












