
পঞ্চম ধাপে দেশের ৭০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ভোটগ্রহণ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোট খুব ভালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। বুধবার (৫ জানুয়ারি) আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইউপি ভোট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন।
হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেন, ৭০ শতাংশের ওপরে ভোট পড়ার আশা করছি। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া নির্বাচন ভালো হয়েছে। সামনে আরো ভালো হবে। এই ভোটে অনিয়মের কারণে ৯টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে।
ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, প্রার্থী ও সমর্থকরা দায় নেবে। কারণ তারা কেন এটি করছেন? এ সময় প্রার্থী ও সমর্থকদের অতি আবেগী না হওয়ারও আহ্বান জানান সচিব।
এদিকে পঞ্চম ধাপের ভোটগ্রহণের দিন সহিংসতায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার (৫ জানুয়ারি) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, গাইবান্ধা, চাঁদপুর, জামালপুর ও বগুড়ায় ৭ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের ৭ নম্বর সিংহরা ওয়ার্ডে দুই মেম্বর প্রার্থীর সংঘর্ষে অংকর দত্ত (৩৮) নামে একজন নিহত হয়েছেন। বুধবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত অংকুর সিহংরা গ্রামের দত্ত বাড়ির নেপাল দত্তের ছেলে এবং টিউবয়েল প্রতীকের মেম্বর প্রার্থী ধনঞ্জয় বিশ্বাসের সমর্থক ছিলেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের দায়িত্বরত জেলা পুলিশের এএসআই আলুউদ্দিন তালুকদার।
মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের ভোটকেন্দ্রের পাশে দুই মেম্বার প্রার্থীর সর্মথকদের সংর্ঘষের মাঝে পরে সমেলা খাতুন (৫০) নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। বুধবার দুপুরে উপজেলার বাচামারা ইউনিয়নের বাচামারা ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের পাশে এ ঘটনাটি ঘটে। নিহত সলেমা ওই এলাকার মাহাতাবের স্ত্রী।
বিষয়টি নিশ্চিত করে শিবালয় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানিয়া সুলতানা বলেন, বাচামারা ইউনিয়নের ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদযালয়ের কেন্দ্রের পাশে দুই মেম্বার প্রার্থীর সর্মথকদের মধ্যে সংর্ঘষের ঘটনা ঘটে। এ সময় ওই নারী সংঘর্ষের মাঝে পড়ে নিহত হন। ঘটনার পর সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আমি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।
গাইবান্ধা: গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় একটি ভোটকেন্দ্রে এক ইউপি সদস্য প্রার্থীর সমর্থককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার বিকালে উপজেলার জুম্মাবাড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জুম্মাবাড়ি আদর্শ কলেজ কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম আবু তাহের (৪০)। তিনি একই ইউনিয়নের মামুদপুর গ্রামের মো. ওমর আলীর ছেলে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানায়, আজ পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে বিকেলে কেন্দ্রের বাইরে সদস্য প্রার্থী আইজল মিয়ার (টিউবওয়েল) সমর্থক আবু তাহেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্ধী সদস্য প্রার্থী রাসেল আহমেদের (পাখা) কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আবু তাহেরকে একা পেয়ে রাসেলের কর্মী-সমর্থকরা ধারালো অস্ত্র কুপিয়ে ও কলা কেটে হত্যা করে।
এ ঘটনার পরপরই কেন্দ্র ও কেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। আবু তাহেরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাঘাটার ইউএনও সরদার মোস্তফা শাহিন। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিংবা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁদপুর: চাঁদপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় ২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একজন কচুয়ার ও আরেকজন হাইমচরের। বুধবার পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলাকালে সহিংসতায় তারা নিহত হন। বুধবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ।
জানা যায়, কচুয়া উপজেলার সাচার এলাকায় নিহত যুবকের নাম শরীফ হোসেন। তার বাবার নাম শহীদ উল্লাহ। দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দিলে ছুরিকাঘাতের শিকার হন শরীফ। হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে হাইমচরের নীলকমল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাহেরচরে বিকেল সাড়ে ৩টায় দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী-সমর্থকদের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে একজন মারা গেছেন। তার নাম-পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি পার্শ্ববর্তী শরীয়তপুরের বাসিন্দা বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
হাইমচর থানার ওসি মাহবুব মোল্লা বলেন, নীলকমল ইউনিয়নে একজন মারা গেছেন। তবে তার নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তদন্তে কাজ করছে পুলিশ।
জামালপুর: জামালপুরের বকশীগঞ্জে মেরুরচর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনায় আল আমিন (২২) নামে একজন নিহত হয়েছেন। তিনি বাঘাডুবা গ্রামের আচ্ছা মিয়ার ছেলে। বুধবারমেরুরচর হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এ সংর্ঘষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে বকশীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম সম্রাট ও ওসি তদন্তসহ কমপক্ষে ৫ পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক আহত হয়েছেন। আহত গ্রামবাসীদের নাম তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়নি। ঘটনায় বকশীগঞ্জ থানা পুলিশের গাড়ি অগ্নিসংযোগসহ পুলিশের এএসপির গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই শতাধিক রাউন্ড গুলিও করা হয়েছে। এ ঘটনায় জামালপুর পুলিশ সুপার নাসির উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সিদ্দিকুর রহমান কেন্দ্রে প্রবেশ করলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোয়ার হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে তারা একত্রিত হয়ে কেন্দ্রের মধ্যে হামলা চালায়। হামলায় এএসপি রাসেল ও বকশীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম সম্রাট অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আগুন দেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে। এ সময় চারটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেয় বিক্ষুব্দ এলাকাবাসী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২ শতাধিক রাউন্ড গুলি করা হয়। পরে র্যাব, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
জামালপুরের এসপি নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ জানান, এ ঘটনায় ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। এ নিয়ে বকশীগঞ্জ থানায় নিয়মিত মামলা করা হবে। অপরাধীদের ছাড় দেয়া হবে না।
বগুড়া: বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়েনে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষে জাকির হোসেন (৩৫) নামের একজন নিহত হয়েছেন। বুধবারপঞ্চম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জাকির উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের জাইগুলি উত্তরপাড়া মৃত লয়া মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় রঙ মিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মেম্বার প্রার্থী সাইদুল ইসলামের (টিউবওয়েল প্রতীক) সমর্থক হিসেবে কাজ করছিলেন।
এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভোটগ্রহণ চলাকালে ইউপি সদস্য প্রার্থী মিঠু মিয়ার (ফুটবল প্রতীক) কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে সাইদুল ইসলামের (টিউবওয়েল প্রতীক) সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় জাকির হোসেনকে প্রতিপক্ষের লোকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি মারা যান।
গাবতলী মডেল থানার ওসি জিয়া লতিফুল ইসলাম বলেন, মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে ভোট কেন্দ্রের বাইরে গ্রামের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিহতের লাশ উদ্ধার করে মর্গে রাখা হয়েছে।











