
পরকীয়ার জাল পেতেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহযোগী অধ্যাপক। বিভাগের ছাত্রী, ব্যাংক কর্মকর্তা ও বাইরের মেয়েদের সঙ্গে রয়েছে তার অবৈধ সম্পর্ক। মাসের পর মাস ছাত্রীদের নিয়ে বাসাতেও থেকেছেন। স্ত্রী প্রতিবাদ করায় তার ওপর চলেছে নির্মম নির্যাতন। আর এ অবৈধ সম্পর্কের কারণে ফাটল ধরেছে ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনের। ওই শিক্ষকের নাম ড. জাফর আহমেদ খান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান, প্রাণ পরিসংখ্যান ও তথ্য পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তার পরকীয়া ও একাধিক মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আমজাদ আলী এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক নিতাই চক্রবর্তী। তার স্ত্রী রেবেকা পারভীন তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এ মামলায় গতকাল তাকে গ্রেপ্তার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরে আদালতে হাজির করলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এ ব্যাপারে রেবেকা পারভীন বার্তা৭১ডটকমকে জানান, একাধিক নারীর সঙ্গে আমার স্বামীর অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। আমি প্রতিবাদ করায় আমাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সংসারে ১৭ বছর বয়সী এক কন্যা ও ১৪ বছর বয়সী এক পুত্র সন্তান রয়েছে। বিভাগের এক ছাত্রীর সঙ্গে রয়েছে তার অবৈধ সম্পর্ক। এর বাইরে এক ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গেও রয়েছে পরকীয়ার সম্পর্ক। পরিসংখ্যান বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভাগে বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের সঙ্গে তিনি নানা কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে জানিয়েছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রীদের তিনি বেশি নম্বরও দেন। তার কক্ষে যোগাযোগ করতে বলেন। কানাডায় পিএইচডি ডিগ্রির জন্য গবেষণারত থাকাকালে ঢাবি’র সাবেক এক ছাত্রীকে তার বাসায় রাখেন প্রায় তিন মাস। স্ত্রী রেস্তরাঁর কাজে চলে গেলে ওই ছাত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে মিলিত হতেন তিনি। বিষয়টি বিদেশে বলে মুখ বুজে সহ্য করেছেন স্ত্রী। মোহাম্মদপুরের বাসাতেও বিভিন্ন সময়ে এক ছাত্রীকে নিয়ে যেতেন ড. জাফর। স্ত্রী প্রতিবাদ করলে বলতেন ওই ছাত্রী তার মেয়ের মতো। রেবেকা পারভীন বলেন, এখন শুনছি তিনি ওই ছাত্রীকে বিয়ে করেছেন। অথচ ওই ছাত্রী বিবাহিতা। প্রতিবাদ করায় ছেলে-মেয়েদের সামনে মুখে আঙুল ঢুকিয়ে স্ত্রীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য গবেষণায় নিয়োজিত থাকাকালে স্ত্রী রেস্তরাঁয় কাজ করে তাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেন। তারপরও যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে বারবার নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হননি তিনি স্ত্রীর নামে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, জমি প্রতারণার মাধ্যমে লিখে নিয়েছেন। রেবেকা পারভীন সন্তানদের নিয়ে মোহাম্মদপুরে মা-বাবার বাসায় থাকেন। তার তিন ভাই আমেরিকা, এক ভাই ইংল্যান্ড ও এক ভাই নৌবাহিনীতে চাকরি করেন। রেবেকা পারভীন বিষয়টি ড. জাফর আহমেদের পরিবারকে অবহিত করলে তারা মীমাংসা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু সুপথে আসেননি তিনি। সর্বশেষ গত ১৮ই মার্চ তার উপস্থিতিতে আত্মীয়স্বজনসহ শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আলোচনা হয়। সবার উপস্থিতিতে আবারও একটি নতুন গাড়ি ক্রয়ের জন্য ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন ড. জাফর। স্ত্রী রেবেকা পারভীন তাকে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে সময় নেয়ার জন্য বললে সন্তানদের ও আত্মীয়স্বজনদের সামনেই তাকে শারীরিকভাবে প্রচণ্ড নির্যাতন করেন তিনি। এতে তার কান কেটে যায় এবং কান দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। পর মুহূর্তে ড. জাফর বাসা থেকে চলে যান। এরপর থেকেই তিনি লাপাত্তা। স্ত্রী, সন্তান ও সংসারের কোন খোঁজ নেন না। বরং ফোনে বিভিন্ন সময় যৌতুকের আরও টাকা দাবি করেন। জাফর আহমেদ খানের পিতা আবদুল আজিজ খান। গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ। রেবেকা পারভীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগে বলেছেন, গত প্রায় ৫ বছর থেকে আমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী ও মেয়েদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। প্রায় তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এক ছাত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সঙ্গে অবৈধভাবে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিভিন্ন সময় এ বিষয়গুলো আমার দৃষ্টিগোচর হয়। এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে আমার স্বামী আমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পরিচিত সহকর্মী, প্রতিবেশী এবং আমাদের সামাজিক অবস্থানে সবাই অবগত। বিভিন্ন সময় নির্যাতন করায় ২৯শে মার্চ আদাবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন রেবেকা পারভীন। ডায়েরি নং ১২৭০। কানাডায় রেস্তরাঁয় কাজ করে অর্থ উপার্জন করে স্বামীকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনে সহায়তা করেন তিনি। সেখানে ৬ বছর থাকাকালে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা উপার্জন করেন। ওই টাকা থেকে ২১ লাখ টাকা দিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে তিন কাঠা জমি কেনেন। কিন্তু প্রতারণার মাধ্যমে সে জমি তার নামে লিখিয়ে নেন ড. জাফর। এখানেই শেষ নয়। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা উত্তোলন করে সাভারে চার কাঠা জমি নিজের নামে কেনেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নানা অর্থনৈতিক সঙ্কটের অজুহাতে দেখিয়ে প্রবাসী ভাইয়ের দেয়া উপহারের প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে বিক্রি করে দেন। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ৩০শে মে ঢাকার বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে যৌতুক নিরোধক আইনের ৪ ধারায় সিআর মামলা করেন রেবেকা পারভীন। মামলা নং ২৭০। আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করে আমলে নেয়ার পর ড. জাফরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়। বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নিতাই চক্রবর্তী বলেন, ড. জাফর আহমেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভাগের সাবেক এক ছাত্রীর সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্কের কথা শুনেছি। বিভাগ থেকে কোন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বিভাগের বাইরের বিষয়। তাই আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আমজাদ আলী বলেন, ড. জাফরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে। ওদিকে গতকাল ড. জাফর স্ত্রীর মামলায় হাইকোর্টে জামিন নিতে যান। হাইকোর্ট জামিন নামঞ্জুর করে। পরে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।









